কাদামাখা মেঠোপথ থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন—মারিয়ার জোড়া স্বর্ণে গর্বিত কিশোরগঞ্জ

- ৬:৩৫ পিএম | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | শুক্রবার
প্রতিদিন কাদামাখা মেঠোপথ পেরিয়ে অনুশীলনে যাওয়া ছিল তার জীবনের অংশ। অর্থাভাব, দীর্ঘ পথ, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব—সব বাধা উপেক্ষা করেও থামেনি তার স্বপ্ন। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফল হিসেবে এবার জাতীয় পর্যায়ে আলো ছড়িয়েছেন কিশোরগঞ্জের ১৪ বছর বয়সী কিশোরী মারিয়া আক্তার তাসফিয়া। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর জাতীয় প্রতিযোগিতায় বালিকা বিভাগের ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জিতেছেন দুটি স্বর্ণপদক।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের সেহড়া পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম মারিয়ার। স্থানীয় আলহাজ্ব ওয়াজেদুল ইসলাম খান উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই দৌড়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তবে প্রতিভা বিকাশের পথ সহজ ছিল না। প্রতিদিন গ্রামের দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে জেলা স্টেডিয়ামে গিয়ে অনুশীলন করতে হয়েছে তাকে।
জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার স্প্রিন্টে হিটে ১৩.৮২ সেকেন্ড সময় নিয়ে ফাইনালে ওঠেন মারিয়া। পরে ফাইনালে সময় কমিয়ে ১৩.৭৫ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে প্রথম স্বর্ণ নিশ্চিত করেন। এরপর ২০০ মিটারেও ২৮.৯৯ সেকেন্ড সময় নিয়ে দ্বিতীয় স্বর্ণ জিতে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
মারিয়ার এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার পরিবারের। কৃষিকাজ করে সংসার চালানো বাবা মো. হিরন মিয়া সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়ের অনুশীলন বন্ধ হতে দেননি। বর্ষার কাদা, দীর্ঘ যাতায়াত ও আর্থিক সংকটের মাঝেও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে পাশে থেকেছেন তিনি।
মেয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা বলেন, জীবনজুড়ে কষ্ট থাকলেও আজ মনে হচ্ছে সব পরিশ্রম সার্থক হয়েছে। তিনি চান, ভবিষ্যতে মারিয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করুক।
স্থানীয়দের কাছেও মারিয়ার সাফল্য এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক। গ্রামবাসীর বিশ্বাস, সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে একদিন আন্তর্জাতিক ট্র্যাকেও দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে পারবে এই কিশোরী।
মারিয়ার দীর্ঘদিনের কোচ মো. আব্দুল জব্বার জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও অনুশীলনে তার একাগ্রতা ছিল অসাধারণ। তিনি মনে করেন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উন্নত পুষ্টি ও আধুনিক ক্রীড়া সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মারিয়া দেশের অন্যতম সেরা স্প্রিন্টার হয়ে উঠতে পারে।
কিশোরগঞ্জ জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় প্রতিযোগিতার আগে মারিয়ার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে তার জন্য ক্রীড়া বৃত্তি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
২৭ জুলাই ঢাকার বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃতি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মারিয়া। তিনি বলেন, এই অর্জন তাকে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সেই জাতীয় পর্যায়ে দুটি স্বর্ণ জয়ের পর তার লক্ষ্য এখন আরও বড়। একদিন এশিয়ান গেমস ও অলিম্পিকের ট্র্যাকে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা বুকে নিয়ে দৌড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
মারিয়ার গল্প শুধু একজন অ্যাথলেটের সাফল্যের গল্প নয়; এটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিবারের ত্যাগ এবং তৃণমূল থেকে উঠে আসা প্রতিভার এক অনন্য উদাহরণ। কিশোরগঞ্জের সেই কাদামাখা মেঠোপথ এখন নতুন প্রজন্মের জন্য স্বপ্নপূরণের প্রতীক হয়ে উঠেছে ।






















